[ad_1]
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করে রায় ঘোষণা করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশে আপিল বিভাগ জানিয়েছেন, ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত বিধানাবলি কেবলমাত্র উক্তরূপ ভবিষ্যৎ প্রয়োগযোগ্যতার ভিত্তিতেই কার্যকর হবে’। ফলে আসন্ন নির্বাচনে ফিরছে না নির্দলীয় এই সরকারব্যবস্থা। অপেক্ষা করতে হচ্ছে নতুন করে সংসদ গঠন এবং তা ভেঙে যাওয়া পর্যন্ত। মামলার আপিল শুনানিতেও বর্তমানে সংসদ কার্যকর না থাকা এবং নতুন করে সংসদ গঠনের পর সংবিধান সংশোধনী গৃহীত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেওয়ায় পরবর্তী নির্বাচন (চতুর্দশ) থেকে নির্দলীয় সরকারব্যবস্থার আর্জি জানিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা। আর এই রায়কে ঘিরে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন মামলা সংশ্লিষ্ট আবেদনকারী ও আইনজীবীরা।
এই রায় ঘোষণার পর জনমনে প্রথম প্রশ্ন হিসেবে হাজির হয়- তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যদি বহাল হলো তবে এর জন্য পরের নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে কেন? এ বিষয়ে সংশ্লিস্ট আইনজীবীরা বলছেন, এই রায় ঘোষণার ভিত্তিতে থার্টিন্থ অ্যামেন্ডমেন্ট বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হল। ইংরেজিতে বলেছেন রিভাইভড অ্যান্ড রেস্টোর্ড। এবং এই রিভাইভ এবং রেস্টোর্ডটা কখন কার্যকর হবে, সেটা বলেছেন সাবজেক্ট টু এনফোর্সমেন্ট অব আর্টিকেল ফিফটি এইট বি অ্যান্ড ফিফটি এইট সি। এর মানে হলো, সংসদ ভেঙে যাওয়ার পনেরো দিনের ভেতরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। এখন যেহেতু সংসদ নাই, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হওয়ার কোনো বিধানও আপাতত কার্যকর হবে না।
তত্ত্বাবধায়ক ছিল, তত্ত্বাবধায়ক নেই
বাংলাদেশ সংবিধানে নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা তথা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা থাকা কিংবা না রাখার বিষয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের ঐক্য-মতানৈক্য বেশ পুরাতন। এরই মধ্যে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়। এর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত হয়।
তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্তিতে ক্ষুব্ধ হয়ে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১৯৯৮ সালে অ্যাডভোকেট এম. সলিম উল্লাহসহ তিন জন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। ওই রিটের শুনানি গ্রহণ করেন হাইকোর্ট। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর বৈধতা প্রশ্নে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।
এরপর ওই রুলের চূড়ান্ত শুনানি হয়। শুনানি শেষে ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট রিটটি খারিজ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে বৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। পরে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল দায়ের করা হয়। আদালত এ মামলায় ৮ জন অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের বন্ধু) নিয়োগ করে তাদের মতামত শোনেন। তাদের মধ্যে ৫ জন সরাসরি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পক্ষে মত দেন। তারা হলেন ড. কামাল হোসেন, টিএইচ খান, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম, ব্যারিস্টার এম. আমীর-উল ইসলাম ও ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ। অপর অ্যামিকাস কিউরি ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কেসি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে মত দেন। ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক ও ড. এম জহির তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার আমূল সংস্কারের পক্ষে মত দিয়ে তাদের প্রস্তাব আদালতে তুলে ধরেন। এছাড়া তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার পক্ষে মত দেন।
এরপর ২০১১ সালের ১০ মে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ৭ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে রায় দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয় এবং যা পরবর্তী ৩ জুলাই গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।
রায় প্রদানকারী বিচারপতিদের স্বাক্ষরের পর ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশিত হয়। তবে সে রায় প্রকাশের আগেই ২০১১ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাদ দিয়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আনে। এরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচন আওয়ামী লীগের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরার পথ সুগম হলো যেভাবে
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরাতে আপিল বিভাগের ২০১১ সালের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট প্রথম আবেদন করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ ৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি। বাকিরা হলেন তোফায়েল আহমেদ, এম. হাফিজউদ্দিন খান, জোবাইরুল হক ভুঁইয়া ও জাহরা রহমান।
এদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একই বছরের ১৬ অক্টোবর এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার গত বছরের ২৩ অক্টোবর পৃথকভাবে পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। এছাড়া নওগাঁর রানীনগরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেনও একই ধরনের আবেদন জানান।
যার ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিগতভাবে মোট চারটি রিভিউ আবেদন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানিতে ওঠে। সেসব আবেদনের শুনানি নিয়ে গত ২৭ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি দেন আপিল বিভাগ। পুনরায় এ বিষয়ে আপিল শুনবেন বলে জানান আদালত।
গত ২১ অক্টোবর নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরাতে আপিলের শুনানি শুরু হয়। পরে গত ২২ অক্টোবর নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরাতে আপিলের দ্বিতীয় দিনের শুনানি শেষ হয়। এ দুদিন রিটকারী বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে শুনানি শেষ করেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। এরপর গত ২৩ অক্টোবর তৃতীয় দিনের মতো মামলাটির শুনানি হয়। গত ২৮ অক্টোবর চতুর্থ দিনের মতো জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি শেষ করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। এরপর গত ২৯ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরাতে আপিলের ৫ম দিন, গত ৩ ও ৪ নভেম্বর ষষ্ঠ, ৭ম ও ৮ম দিনের মতো শুনানি করেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন ও ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। নবম দিনে আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
পরে গত ১০ দিনে মামলার সব পক্ষের আবেদনের শুনানি শেষে গত ১১ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে ৭ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ রায়ের জন্য বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) দিন ধার্য করেছিলেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এ দিন সকালে মামলাটির রায় ঘোষণা করলেন আপিল বিভাগ।
দীর্ঘ সংগ্রামের পর আবার দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন মামলার অন্যতম আপিলকারী বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায়টি ছিল অসাংবিধানিক ও ত্রুটিপূর্ণ। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক যে রায় দিয়েছিলেন, তার মাধ্যমে দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। যার ফলে গত তিনটি নির্বাচন বিতর্কিত হয়েছে। আজকের রায়ের মাধ্যমে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হবে।’
রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশে যা বলা হয়েছে
আপিলসমূহ সর্বসম্মতভাবে মঞ্জুর করা হলো এবং সিভিল রিভিউসমূহ সেই আলোকে নিষ্পত্তি করা হলো। ‘আদালত এই মর্মে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে পর্যালোচনাধীন আপিল বিভাগের রায়টি নথি দৃষ্টে স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান একাধিক ত্রুটিতে ত্রুটিপূর্ণ।’ অতএব, পর্যালোচনাধীন রায়টি এতদ্বারা সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা হলো। ফলশ্রুতিতে, সংবিধানের চতুর্থ ভাগের পরিচ্ছেদ ২ক-এর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কিত বিধানাবলি, যা সংবিধান (ত্রয়োদশ সংশোধন) আইন, ১৯৯৬ (১৯৯৬ সনের ১নং আইন)-এর ধারা ৩ দ্বারা সন্নিবেশিত হয়েছিল, তা এতদ্বারা এই রায়ের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত ও সক্রিয় করা হলো।
যদিও এইরূপ পুনরুজ্জীবন পরিচ্ছেদ ২ক-এ বর্ণিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত বিধানাবলির স্বয়ংক্রিয় পুনঃস্থাপন নিশ্চিত করে, তবে পুনরুজ্জীবিত অনুচ্ছেদ ৫৮খ (১) এবং অনুচ্ছেদ ৫৮গ (২)-এর বিধানাবলির প্রয়োগ সাপেক্ষে এটা কার্যকর হবে।
‘পুনঃস্থাপিত ও পুনরুজ্জীবিত পরিচ্ছেদ ২ক-এ বর্ণিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত বিধানাবলি কেবলমাত্র উক্তরূপ ভবিষ্যৎ প্রয়োগযোগ্যতার ভিত্তিতেই কার্যকর হবে।’
মামলার পূর্ণাঙ্গ আদেশ পরবর্তীতে প্রদান করা হবে বলে সংক্ষিপ্ত রায়ে জানানো হয়েছে। এই রায়ের ফলে দিনটিকে বাংলাদেশের মানুষদের জন্য ঈদের মতো বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি ও সিনিয়র অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। তিনি বলেন, ‘আদালত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে এই রায় প্রসপেক্টিভ (ভবিষ্যৎমুখী)। বিএনপির পক্ষ থেকে তারা আগেই আবেদন করেছিলেন যে আপিল ও রিভিউ নিষ্পত্তির সময় আদালত যেন রায়টি প্রসপেক্টিভ বলে ঘোষণা করেন। সেই আর্গুমেন্ট আদালত গ্রহণ করেছেন এবং জাজমেন্টে উল্লেখ করেছেন যে আইনজীবীদের দেওয়া যাবতীয় যুক্তি তারা বিশ্লেষণে নিয়েছেন।’
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় জামায়াত ইসলামীর অন্যতম আইনজীবী মো. শিশির মনির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই রায় ঘোষণার ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হলো। সংসদ ভেঙে যাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে এই সরকার গঠিত হবে। আজকের রায়ে বলা হয়েছে, এটা প্রসপেক্টিভ। ফলে এই নির্বাচন (আসন্ন) বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই হবে। তারপর থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। কারণ, এখন তো সংসদ নেই। তাই চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে এই সরকারব্যবস্থা কার্যকর হবে।’তিনি আরও বলেন, “জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রথম ‘কেয়ারটেকার’ সরকারের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এখন সবাই এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে। দলের স্বার্থ না, গণতন্ত্রের স্বার্থে আমরা ‘কেয়ারটেকার’ সরকার চেয়েছিলাম।” জনগণ এখন স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এবারই এটা ব্যবহারের সুযোগ নেই বলেও তিনি গণমাধ্যমকে জানান।
[ad_2]
